নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারিম। প্রিয় পাঠক, পবিত্র রমজান উপলক্ষে "খিলাফা মর্নিং২৪" এর পক্ষ থেকে ধারাবাহিক আলোচনার প্রথম পর্বে আমরা রমজান শরীফের হক বা দাবি সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। রমজান শরীফের নিয়ামত এবং বান্দার প্রতি আল্লাহ পাকের যে প্রতিশ্রুতি তা পাওয়ার জন্য নূন্যতম যে যোগ্যতা (ঈমান) এ বিষয়ে আলোচনা করেছিলাম।
আমরা আজকে ধারাবাহিক আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে কিভাবে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সর্বাধিক ভালোবাসা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
রাসূলে আকরাম সাঃ এর মোহাব্বত কিভাবে লাভ করবঃ প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "তোমাদের মধ্য থেকে সেই ব্যক্তি ঈমানদার হবে না; যদি কারো নিকট আমি নবী তার পিতা-মাতা সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানব মন্ডলী অপেক্ষা অধিকতর ভালবাসার পাত্র না হই।"
আমরা যদি একটু খেয়াল করি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুমিনদেরকে তার হাবিবের প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন; তার আগে তিনি নিজে সমস্ত ফেরেশতাগণকে নিয়ে স্বীয় নবীর উপর অবিরত সালাত পেশ করছেন এই ঘোষণা দিয়েছেন। তার ব্যাখ্যা হচ্ছে এমন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে এত প্রিয় ও ভালোবাসার যে তিনি এবং তার সমস্ত মালাইকাগণ নবীর উপর সালাত প্রেরণ করতে ‘মশগুল’।
নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত সহ শরীয়তের সমস্ত আবশ্যক হুকুম আহকাম গুলোর বাইরে কোন ধরনের শর্তবিহীনভাবে আল্লাহপাক যে নির্দেশ দিয়েছেন মুমিনদেরকে যে তোমরা নবীর প্রতি সলাত পেশ করো এবং সর্বোত্তম পন্থায় সালাম জানাও। আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে ঈমানদারগণের প্রতি এটা বিশেষ নির্দেশ।
অর্থাৎ একজন মুমিন যদি সমস্ত ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব আমল যথাযথ ভাবে করে কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই নির্দেশের দ্বারা যেইভাবে নবীর প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করার হুকুম দিয়েছেন সেই ভাবে আদায় না করেন তাহলে ওই ব্যক্তি আল্লাহ পাকের দরবারে পাকড়াও হবেন তাতে সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দুরুদ পেশ করা ছাড়া কোনো আমল আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না।
নবী মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সমস্ত নবীগণের নবী, সমস্ত ফেরেশতাগণের নবী এমনকি সমস্ত মাখলুকাতেরও নবী। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তিনি সারা জাহানের প্রতিপালক ও অধীশ্বর; নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাঃ রহমাতুল্লিল আলামিন তিনি সমগ্র জাহানের জন্য রহমত। আল্লাহ পাকের রাজত্ব যত দুর বিস্তৃত নবী যে রহমত সেটাও ততদূর বিস্তৃত।
আমরা সকলেই জানি একজন মুমিন যখন মারা যায় তাকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় যখন লাশ কবরে নামানো হয় তখন একটি দোয়া পড়া হয়। সেই দোয়াটি হল, "বিসমিল্লাহি আলা মিল্লাতে রাসুলিল্লা"। অর্থাৎ আল্লাহপাকের নামে এই মরদেহকে রাসুলুল্লাহর দলে রাখলাম।
এরপর যখন মায়্যেতকে কবরে সবাই রেখে চলে আসে, ঐ অন্ধকার কবরে তিনি একাই থাকেন।
কবর দেশে যখন কোন মুমিনকে রাখা হয় তখন প্রিয় নবীজির নিকট সংবাদ দেওয়া হয়, যে আপনার অমুক উম্মাত মৃত্যুবরণ করেছে, তাকে কবরে রাখা হয়েছে।
এবার পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় রসূলুল্লাহ সঙ্গে যার আত্মার সম্পর্ক যত বেশি গভীর ছিল নবীজি তার নিকট তত বেশি আপন এবং সহায় হয়ে সাক্ষাৎ দিবেন।
প্রিয় মুসলিম রোজাদার ভাই এবং বোনেরা। কবর দেশে আপনার পার্থিব জীবনের কোনো সম্পদ, কোনো স্বজন, কোনো ক্ষমতা সঙ্গী হবে না বা কাজে আসবে না। শুধুমাত্র আপনার সঙ্গী হবে রাহমাতুল্লিল আলামিন সাইয়েদিনা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর আপনার যত নেক আমল আছে সবার আগে কাজে লাগবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালামের প্রতি দুনিয়ার জমিনে আপনি হৃদয়ে যত ভালোবাসা রেখেছেন মহাব্বত রেখেছেন শুধু তাই।
কবরে যদি রসূলুল্লাহর পরিচয় পাওয়া যায় তবেই কেবল কবরে রেহাই। আর যার কবরে রেহাই মিলবে তার হাশর-মিজান কোথাও আর বিপদ হবে না। আর কবরে নবীজির পরিচয় পাওয়ার একমাত্র আমল হচ্ছে দুনিয়ার জমিনে থাকা অবস্থায় রসূলুল্লার প্রতি বাঁধভাঙ্গা ভালোবাসা।
সহজ ভাষায় বললে, আপনার অন্তরে যদি প্রিয় নবীজির প্রতি মহাব্বত পৃথিবীর সবকিছুর চাইতে বেশি না হয় তাহলে আপনি কবরে পার পাবেন না। কবরে যদি পার না পাওয়া যায় তাহলে হাশর-মিজান-পুলসিরাত কোথাও পার হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সুতরাং এটাই প্রতীয়মান হয় হৃদয়ে নবীজির প্রতি অন্তহীন ভালোবাসা ছাড়া জীবনে কোন ভাল আমলের সামান্যতম বিনিময় পাওয়া সম্ভব নয়।
এতো গেল নবীর প্রতি অগাধ ভালোবাসা রাখার গুরুত্বের বিষয় আলোচনা। এখন প্রসঙ্গ হচ্ছে কিভাবে নবীজিকে সর্বাধিক ভালোবাসা যায়?
এই বিষয়ে অনেকে বলে থাকেন নবীর সুন্নতের সর্বোচ্চ অনুসরণ করাযই নবীর প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু কথাটি পরিপূর্ণ সত্য নয়।
ভালোবাসা হচ্ছে হৃদয়ের ব্যাপার। এটা প্রদর্শন বা পরিমাপ যোগ্য নয়। আক্ষরিক অর্থে যারা এই কথা বলে থাকেন তারা মূলত বাহ্যিক বেশ-ভূষা চাল-চলন, নামাজ-বন্দেগীতে যে সুন্নাহ প্রকাশ পায় সেটাকেই নির্দেশ করে থাকেন। অথচ রাসুল পাক সাঃ এর জীবদ্দশায় যারা মুনাফিক বলে চিহ্নিত হয়েছিল তাদের সকলেই বাহ্যিক সুন্নতের সর্বোচ্চ অনুসরণকারী ছিলেন। যাদের সুন্নাতের আমল দেখে বড় বড় সাহাবাগণ সমীহ করতেন।
অথচ তাদের হৃদয়ের গভীরে ভালোবাসা না থাকার কারণে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে মোনাফিক বলে আখ্যায়িত করে চিহ্নিত করে বিতাড়িত করে দিলেন। এমনকি নবীজীকে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন ওই মুনাফিকদের জানাজা পড়তে না যান এবং তাদের পক্ষ হয়ে আল্লাহ পাকের কাছে কোন প্রার্থনা না করেন।
কি সাংঘাতিক বিষয় ভেবেছেন কখনো?
যারা নবীজির প্রতি ঈমান এনেছে, তাকে দেখেছে তাকে অনুসরণ করেছে, তাকে অনুকরণ করেছে অথচ হৃদয়ে নবীর প্রতি শর্ত হীন ভালোবাসা ও আনুগত্য না থাকার কারণে আল্লাহ পাক তাদেরকে জাহান্নামে সবচাইতে নিকৃষ্টতম জায়গায় শাস্তি দেওয়ার ঘোষণা দিলেন।
এবার একটু নিজের দিকে তাকান। নিজেকে প্রশ্ন করুন আমি কি আল্লাহর রাসূলকে সবকিছুর থেকে বেশি ভালবাসতে পেরেছি?
আবার প্রশ্ন করুন আমি কি তার সমস্ত নির্দেশ বিনা বাক্যে গ্রহণ করতে পেরেছি?
আপনার জবাব যদি হয় হ্যাঁ, তাহলে আপনি পরম ভাগ্যবান।
আর যদি এর উত্তর হয় না তাহলে এবার ভেবে দেখুন আপনার সমস্ত আমল বা সদকা রোজা নামাজ এসবের কী মূল্য আল্লাহ পাকের দরবারে?
সুতরাং হে মুমিন আপনার নাজাতের প্রথম আমল হচ্ছে হৃদয়ে নবী প্রেম ধারণ করে।
এরপর আল্লাহপাকের যত হুকুম আহকাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম এবং তার সাহাবাগণ যেইভাবে পালন করেছেন সেই ভাবে মেনে চলা সুন্নাত।
অর্থাৎ হৃদয় থেকে নবীকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভালোবাসা ঈমানের শর্ত অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্যই ফরজে আইন। এরপরে নবী করীম সাঃ এর সুন্নতে অনুসরণ করা উম্মাতের জন্য নবী প্রেমের প্রকাশ মাত্র। আর ঊহা আল্লাহকে ভালোবাসার শর্ত। অর্থাৎ নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম আল্লাহকে যেভাবে ভালোবেসেছেন, যেভাবে তার কথা তার নির্দেশ মান্য করেছেন সেই ভাবে জীবন যাপন করাই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালবাসার নিদর্শন। কিন্তু নবীর প্রতি ভালোবাসা নির্দেশন একটাই তা হচ্ছে আপনার অন্তর আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে ছাড়া আর কোন কিছুর জন্য-ই লালায়িত হবে না।
আল্লাহ পাক আমাদেরকে সর্বোত্তম পন্থায়; হয় নবীকে সালাত ও সালাম দেওয়া এবং নবীর প্রতি হৃদয় জুড়ে ভালোবাসা পোষণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন !!
(চলবে ……)

0 Comments