আধুনিক সভ্যতা, প্রযুক্তি জ্ঞান ও সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে আমরা প্রায় সকলেই ইমাম মাহদী (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং তাদের যুগ ও শাসনকাল সম্পর্কে অনেক বিষয়ই জেনেছি। তবে এসবের মাঝে সবই যে সত্য জেনেছি এমনটা নয়, আবার সকল সত্য যে জানতে পেরেছি তাও নয়। বরং সত্য-মিথ্যা সংমিশ্রণের এই সময়ে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য অনেকের অজানাই থেকে যায়।
তাই পবিত্র মাহে রমজানের আজকের এই দিনে ইমাম মাহদীর (আঃ) যুগ, সেই যুগের নীতি-দর্শন এবং তার বিষয়ে বিশেষ কিছু ব্যতিক্রমী আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বলে রাখি, যে ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম এবং তার যুগ সম্পর্কে সাধারণত যে তথ্যগুলো প্রচলিত আছে সেসব বিষয়ে আমরা আজ কোনো আলোচনা করব না। শুধুমাত্র বিশেষ যে বিষয়গুলো সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয় না বা আলোচনায় আসেনা সেই বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলব আজ।
১। ইমাম মাহদী (আ) সালাম শৈশব কাল থেকে অন্য দশটি শিশুর মতই সাধারণ ও স্বাভাবিক আচার-আচরণ, স্বভাব, ও যোগ্যতা সম্পন্ন হবেন বলেই তাকে কেউ চিনতে পারবে না।
২। বস্তুত তিনি আম্বিয়াগনের মত নির্বাচিত হয়েই পৃথিবীতে আসবেন, তবে পৃথিবীতে আসার পর পরিণত বয়সে আল্লাহপাকের কুদরতে এবং বিশেষ দয়ায় তিনি প্রকাশিত হবেন।
৩। একটি বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য তার মাঝে থাকবে যা ভাগ্যবান ছাড়া কেউ নির্ণয় করতে পারবে না। সেটা হচ্ছে তিনি পরিণত বয়সের কাছাকাছি এসে যুগের মাত্রা অনুযায়ী যে বয়সে মানুষ সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা, যে বয়সে মানুষ সংসার ও উৎপাদন মুখর হওয়ার কথা কিন্তু সেই বিষয়ে বয়সে তিনি তার সমাজে, তার পরিবারের এবং তার ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে অনেকটা অকর্মণ্য-অথর্ব যুবক হিসেবে অনাদরণীয়ই হয়ে থাকবেন ।
৪। তিনি বিশেষ কোনো খারাপ গুণের অধিকারী হবেন না, অত্যন্ত সাধারণ প্রকৃতির ভালো মানুষই হবেন।তবুও তার জনপদে তাকে নিয়ে তেমন সুনাম, বা মুখরোচক কোন আলোচনা থাকবে না। দোষ না করেও অপবাদের ভাগী হবেন। অনেকটা অবহেলিতই থাকবেন।
৫। ব্যক্তিগতভাবে যোগ্য হওয়ার পরেও তার কোনো সামাজিক সাফল্য দৃশ্যমান থাকবে না। তার জ্ঞান এবং দক্ষতার কোনো মূল্যায়ন থাকবে না। তবে প্রকৃত অর্থেই তার ভিতরে লুকানো তাকওয়া, সততা ও নবী প্রেম ছাড়া বিশেষ কোন ধরনের বদ অভ্যাস থাকবে না।
৬। ওনার আবির্ভাবের যুগের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হবে ওই যুগে বিশ্বজুড়েই প্রচুর দক্ষ, যোগ্যতা সম্পন্ন ও সৎ যুবকরা সমাজে ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে উপেক্ষিত থাকবেন। যারা সার্বিক বিবেচনায় ত্রুটিমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের কোন সাফল্যের চিহ্ন দৃশ্যমান থাকবে না।
৭। তাকওয়াবান ও সদাচারী ওই মানুষগুলোই মূলত সবার আগে ইমাম মাহাদীর সৈনিক হবে। অর্থাৎ তার যুগের তার আত্মপ্রকাশ এর পূর্বে তার মতো বৈশিষ্ট্যমন্ডিত অসংখ্য যুবক থাকবে বিশ্বজুড়ে।
৮। তার যুগের মূল স্তম্ভ হবে রহমত; তথা প্রেম, ক্ষমা, মমতা ও ইনসাফের অপূর্ব সেতু বন্ধন। এটা এমন এক যুগ যখন ন্যায়, আধ্যাত্মিকতা ও সত্য পৃথিবীজুড়ে বিকশিত হবে। যেমন প্রতিটি ঐশী কর্মের সূচনায় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” উচ্চারিত হয়, তেমনি আবির্ভাবের যুগের শুরুতেও এই আয়াত মানবজীবনে বাস্তব রূপে প্রতিফলিত হবে। সুতরাং রহমত শুধু একটি নৈতিক শক্তি নয়, একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ ঐশী সভ্যতার চালিকাশক্তি; যে সভ্যতা তাওহিদ, সহমর্মিতা, ক্ষমাশীলতা ও মানব মর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠার এই মহা-রূপান্তরকে সম্ভব করে তুলবে শুধু শক্তি বা কঠোরতা নয়; বরং রহমতের বিস্তার। রহমত মানে হৃদয় উন্মুক্ত করা, বিদ্বেষ দূর করা এবং মানুষকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা।
৯। হাদিসগ্রন্থসমূহের বর্ণনা অনুযায়ী, বিশেষত মহানবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইতের অনুসারীদের বক্তব্য ও লেখালেখি অনুযায়ী, হজরত ইমাম মাহদি (আ.)' রহমতের দর্শনে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলবেন, যেখানে ন্যায়বিচার হবে দয়া-ভিত্তিক; ন্যায়বিচার কেবল দুষ্টদের শাস্তি দেয়া নয়, একইসঙ্গে ক্ষত সারিয়ে তোলা ও ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করারও মাধ্যম।
১০। হজরত ঈসা (আ.)নিজেও প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তা ইমাম মাহদীকে (আ) সহায়তা করতে একই রহমতের চেতনায় মানুষের মধ্যে ভেঙে-যাওয়া সেতুগুলো পুনঃনির্মাণ করবেন এবং ভালোবাসা ও সহমর্মিতার ভাষায় শান্তির বার্তা পুনরায় উচ্চারণ করবেন। এই দুই মহান সত্তা প্রকৃতপক্ষে একই সত্যের দুই প্রকাশ—ঐশী রহমত। পরিশেষে, আমরা বলতে পারি, তার আবির্ভাবের দর্শনই রহমত। এটি এমন এক দর্শন, যা অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে বর্জনের পরিবর্তে আলিঙ্গনের কথা বলে; ভয়ের পরিবর্তে আশা সৃষ্টি করে; ক্ষতের পরিবর্তে আরোগ্য সাধন করে। একই সঙ্গে অশুভ ও অত্যাচারের নেতারা ন্যায়বিচারের সম্মুখীন হবে, যাতে রহমত ও শান্তির বিস্তারের পথ সুগম হয়।
এটাই সেই মহান রহস্য, যা মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাবে এবং বিশ্বকে সকল মানুষের জন্য একটি ভারসাম্য বাসভূমিতে পরিণত করবে।
------এস আর প্রিন্স
.jpg)
0 Comments